হেযবুত তওহীদের সভা-সমাবেশ ও একটি বিভ্রান্তিকর প্রশ্নের জবাব | হেযবুত তওহীদ

হেযবুত তওহীদের সভা-সমাবেশ ও একটি বিভ্রান্তিকর প্রশ্নের জবাব

মোহাম্মদ আসাদ আলী
আমাদেরকে অর্থাৎ হেযবুত তওহীদকে প্রায়ই একটি ‘হাস্যকর’ প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় যে, ‘আপনারা ইসলামের কাজ করছেন অথচ বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন না, সরকার আপনাদেরকে বাধা দেওয়ার বদলে সভা-সমাবেশ করার অনুমতি দিচ্ছে, ব্যাপারটা কী ভাই?’ এই প্রশ্নটার সাথে আমার মনে হয় হেযবুত তওহীদের ভাই/বোনেরা কম-বেশি সবাই পরিচিত আছেন, কারণ এর জবাব তাদেরকে প্রতিনিয়তই দিতে হচ্ছে, ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও বহুবার এই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রশ্নটা যারা করেন তারা উত্তর পাবার আশায় করেন না, প্রশ্নটা করে জনমনে হেযবুত তওহীদ সম্পর্কে একটি সন্দেহ সৃষ্টি করে দেওয়াই থাকে তাদের মূল্য উদ্দেশ্য এবং এই প্রশ্নকারীদের পরিচয়ও সহজেই অনুমেয়।

ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করতে গিয়ে একটি শ্রেণি এতটাই নাজেহাল হয়েছেন যে, সভা-সমাবেশ করা তো দূরের কথা, নিজেদেরকে ঐ রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী বলে প্রকাশ্যে পরিচয় দিতেও পারেন না প্রতিপক্ষের ধরপাকড়ের মুখে পড়তে হয় বলে। সেই শ্রেণিটি যখন দেখেন হেযবুত তওহীদ সারা দেশে ক্রমাগত সভা-সমাবেশ করে চলেছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ হেযবুত তওহীদের বক্তব্যের সাথে সহমত পোষণ করে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে, তখন স্বভাবতই তারা উপরোক্ত প্রশ্নটি করে কিছুটা সান্ত¦নাবোধ করেন!

হেযবুত তওহীদ সারা দেশে ক্রমাগত জনসভা, আলোচনা সভা, কর্মি সভা, সংবাদ সম্মেলন, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী ইত্যাদির আয়োজন করে চলেছে এটা দিবালোকের ন্যায় সত্য, কিন্তু তার আড়ালে আরেকটি সত্য আছে যেটা ঐ প্রশ্নকারীরা জানেন না বা জানলেও জনগণকে বলতে চান না। প্রকৃতপক্ষে আমরা দশটা জনসভার অনুমোদন চাইলে হয়ত একটার অনুমোদন পাই, তাও বহুপ্রকার শর্তসাপেক্ষে। কয়টার বেশি মাইক লাগানো যাবে না, কতক্ষণের মধ্যে সভা শেষ করতে হবে, বড়জোড় কতজন মানুষ জমায়েত হতে পারবে ইত্যাকার নানান বেড়াজালে এমনভাবে আবদ্ধ থাকতে হয় যে, সামান্য উনিশ বিশ করার সাধ্য নেই, করলে মাইকের তার কেটে দেওয়ার উদাহরণও আছে।

এই যে বহুবিধ শর্তসাপেক্ষে দশটা দরখাস্ত দিয়ে একটা জনসভার অনুমোদন পেলাম এটার অনুমোদন পেলাম প্রথমত এই কারণে যে, গত ২৩ বছর ধরে নানান নির্যাতন হয়রানির শিকার হয়েও, বহু ভাইবোনের রক্ত ঝরলেও আমরা রাষ্ট্রের একটিও আইন ভঙ্গ না করার অনন্য নজির স্থাপন করতে পেরেছি। অতীতে আমাদের বিরুদ্ধে সন্দেহমূলক ও নিপীড়নমূলক বহু মামলা দায়ের করা হয়েছে। কোথাও ইসলামবিদ্বেষী মিডিয়ার অপপ্রচার, কোথাও ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ইন্ধনে আমাদের সদস্যরা বারবার নির্যাতন ও হয়রানির মুখে পড়েছেন। কিন্তু আমরা সমস্ত কিছু নীরবে সহ্য করে গেছি আন্দোলনের কেবল একটি নীতির কারণে যে- ‘আমরা রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গ করব না’। সত্যিই আমরা জীবন দিয়েছি কিন্তু আইন হাতে তুলে নিই নি। ২৩ বছর ধরে আমরা রাষ্ট্রীয় আইন শৃঙ্খলা মেনে চলার যে অনন্য নজির স্থাপন করেছি তা কোনো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও স্থাপন করতে পারে নাই, কাজেই আমাদেরকে জনসভা করতে না দেওয়াটা কেবল অযৌক্তিকই নয়, অনৈতিকও বটে। হয়ত সেই চেতনা থেকেই দশটা আবেদন করলে একটার অনুমোদন দিচ্ছেন তারা।

দ্বিতীয়ত, আমরা আমাদের সভা-সমাবেশে কী বলি তা ভিডিও আকারে ফেসবুকে ইউটিউবে ছড়িয়ে আছে, যে কেউ ইচ্ছে হলেই দেখতে পারবেন। জনসভা চলাকালীনই বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন এসে আমাদের বক্তব্য রেকর্ড করে নিয়ে যান, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। সরকারের উচ্চ মহল অব্দি সেগুলো পৌঁছে যাবার কথা। যদি আমাদের উচ্চারিত একটা বাক্যাংশও তারা অযৌক্তিক পেতেন, ক্ষতিকর পেতেন তাহলে নিশ্চিত জেনে রাখুন- একটা জনসভার অনুমোদনও আমাদের নসিবে কুলোতো কিনা সন্দেহ! আমাদের বইগুলো পড়লে ও ভাষণগুলো দেখলে সবাই বুঝবেন আমরা একটাও জাতিবিনাশী কথা বলি না, একটাও বিদ্বেষ সৃষ্টিকারী কথা বলি না, একটাও সা¤প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টকারী কথা বলি না, বরং আমাদের প্রতিটি বক্তব্য জনকল্যাণমুখী, উপকারী বক্তব্য। আমাদের বক্তব্য শুনে দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ জঙ্গিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে, ইসলামের প্রকৃত ব্যাখ্যা জানতে পারছে, জাতি ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। একটি রাষ্ট্রের কর্ণধাররা সেটাই তো চাইবেন, তাই নয় কি? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেই বারবার দেশবাসীকে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা দেওয়ার জন্য সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তাহলে সরকার কেন আমাদেরকে সভা-সমাবেশ করার অনুমতি দিবে না? যারা হেযবুত তওহীদ সম্পর্কে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে চান এবং অভিমানে গাল ফুলিয়ে প্রশ্ন করেন, হেযবুত তওহীদকে কেন সরকার জনসভার অনুমতি দিচ্ছে তারা নিশ্চয়ই দেখছেন সরকার সারা দেশে হাজার হাজার ওয়াজ-মাহফিলেরও অনুমতি দিচ্ছে, তবে কি ওয়াজ-মাহফিলগুলোও তাদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ? হেযবুত তওহীদ একটি অরাজনৈতিক আন্দোলন, সভা-সমাবেশ করার বৈধ অধিকার আমাদের আছে, আমরা যে অনুমোদন পাই সেটা আমাদের প্রতি কারো করুণা নয়, ওটা আমাদের প্রাপ্য। শুধু হেযবুত তওহীদ কেন, দেশের অন্যান্য অরাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলোকেও সভা-সমাবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়েছে এমনটা আমাদের নজরে পড়ে নাই, যদিও আমাদেরকে বহুবার বাধা দেওয়া হয়েছে, আমাদের সমাবেশ পণ্ড করা হয়েছে কোনো কারণ ছাড়াই।

‘অরাজনৈতিক আর রাজনৈতিক’- এই দুইটি শব্দেই বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়ে যায়। এমনতিইে আমাদের দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস সুখকর নয়, রাজনীতির নামে হানাহানি জ্বালাও পোড়াও হরতাল অবরোধের সংস্কৃতি বহু যুগ ধরে চলে আসছে। সরকারী দল বিরোধী দলগুলোকে কোনঠাসা করে রাখবে, আর বিরোধী দলগুলো সুযোগ পেলেই সরকারের কণ্ঠনালী চেপে ধরবে- এ যেন রাজনীতির অমোঘ বিধান! এখানে কোন্ দল কোন্ আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করে সেটা মুখ্য নয়, ক্ষমতার প্রশ্নে সবগুলো দলই একে অপরের সাথে গাঁটছড়া বাঁধেন আবার ক্ষমতার প্রশ্নেই একে অপরকে জেলের ভাত খাওয়ান। যারা বলেন ইসলামের কথা বলার কারণে নির্যাতিত হচ্ছেন তাদের চাইতে এক কালে বামপন্থীরাও কম জেল-জরিমানার শিকার হয় নাই। বস্তুত ক্ষমতায় যাওয়া এবং ক্ষমতা ধরে রাখার এই কামড়াকামড়িতে যারা ইসলামকে মই হিসেবে ব্যবহার করেছেন তারা ইসলামকেই খাটো করেছেন, ইসলামের মত সুমহান আদর্শের গায়ে কলঙ্কের কাদামাটি লাগিয়েছেন। ইসলামের নামে তাদের ধান্দাবাজী দেখে দেখে মানুষ এতটাই বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছে যে, এখন প্রকৃত ইসলামের কথা বললেও অনেকে সন্দেহের চোখে তাকায়! খুব আফসোস হয় যখন তারা ঐ হানাহানির রাজনীতি করতে গিয়ে, আল্লাহ-রসুলকে নিয়ে পলিটিক্স করতে গিয়ে প্রতিপক্ষের কায়দা-কৌশল ঠিকমত না বোঝার কারণে ধরা খান এবং তারপর ‘ইসলাম গেল ইসলাম গেল’ জিগির তুলে মানুষের সহানুভ‚তি লাভ করতে চান। আপনারা ধর্মের নামে সহিংস জাতিবিনাশী রাজনীতি করবেন, আল্লাহু আকবার ¯েøাগান দিয়ে পেট্রল বোমা মেরে নিরীহ মানুষ হত্যা করবেন, জাতির লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট করবেন, ইট দিয়ে পুলিশের মাথা থেঁতলে দিবেন, তারপর পুলিশের ধাওয়া খেয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে আমাদের দিকে আঙ্গুল তুলে বলবেন- ‘আমরা ইসলামের কথা বলার কারণে ধাওয়া খাচ্ছি, তোমরা কেন ধাওয়া খাচ্ছ না’- এর চেয়ে হাস্যকর প্রশ্ন আর কী হতে পারে?