মাননীয় এমামুযযামানের লেখা থেকে: কিভাবে জন্ম হোল দাজ্জালের! | হেযবুত তওহীদ

মাননীয় এমামুযযামানের লেখা থেকে: কিভাবে জন্ম হোল দাজ্জালের!

Kivabe-jonmo-holo-dajjaler- Kivabe-jonmo-holo-dajjaler

মোহাম্মদ ইয়ামিন খান

মানবজাতি আজ এমন একটি সভ্যতাকে নিজেদের জীবনে ধারণ কোরে আছে যার সঙ্গে স্রষ্টা, আল্লাহর কোন সম্পর্ক নেই। যেই আত্মাহীন, স্রষ্টাহীন বস্তুবাদী যান্ত্রিক সভ্যতা মানুষের মনুষ্যত্বকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস কোরে দিয়েছে, এখন শারীরিকভাবেও তাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে। এই ভয়াবহ বিপদের কারণ যে বস্তুবাদী ইহুদি খ্রিস্টান ‘সভ্যতা’ অর্থাৎ দাজ্জাল, তার জন্ম কিভাবে হোল?
আল্লাহ তার সৃষ্ট প্রথম মানুষটি অর্থাৎ আদম (আ:) থেকে শুরু কোরে মোহাম্মদ (দ:) পর্যন্ত যুগে যুগে প্রতি জনপদে নবী পাঠিয়ে মানুষকে জীবন-বিধান অর্থাৎ দীন দান কোরেছেন। তাই আল্লাহ তার দেয়া জীবন-বিধানের নাম দিয়েছেন ইসলাম অর্থাৎ শান্তি। মোহাম্মদের (দ:) আগে ঐ নবীরা (আ:) তাদের নিজ নিজ সম্প্রদায়, গোষ্ঠী ও জাতির জন্য বিধান নিয়ে এসেছেন। নবীদের মধ্যে দুটো পরিষ্কার ভাগ দেখা যায়। একটি ভাগ হলো যারা আইন-কানুন, রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক বিধান ও দণ্ডবিধি নিয়ে এসেছেন, আরেকটি ভাগ হোল ঐগুলোর সঙ্গে যে আত্মার উন্নতির জন্য যেসব কর্মকাণ্ড দরকার তাও ঐ আইন-কানুনের সাথে ভারসাম্যযুক্ত হোয়ে এসেছে। নবী-রসুলগণ (আ:) যে দীন, আইন-কানুন, দণ্ডবিধি নিয়ে এসেছিলেন নবী-রসুলরা (আ:) বিদায় নেয়ার পর মানুষ এবলিসের প্ররোচনায় সেগুলোকে দুমড়িয়ে মুচড়িয়ে বিকৃত কোরে ফেলেছে আবার আল্লাহ নবী-রসুল পাঠিয়েছেন; এমনকি পূর্ববর্তী দীনগুলোর হর্তাকর্তা পুরোহিত শ্রেণিদের দীনের বিশ্লেষণ ও অতি বিশ্লেষণ করার ফলে আত্মার উন্নতি হারিয়ে গিয়ে ভারসাম্যহীন হোয়ে গিয়েছিলো সেই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে আল্লাহ নবী (আ:) পাঠালেন। যেমন বৈদিক ধর্মের বিকৃতি সংশোধন কোরে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে আল্লাহ পাঠালেন কৃষ্ণ (আ:), বুদ্ধ (আ:), যুধিষ্ঠির (আ:) এবং মহাবীর (আ:) কে ঠিক তেমনি মুসা (আ:) এর আনীত শরিয়াহর বিকৃতি সংশোধনের জন্য আল্লাহ বনী ঈসরাইল তথা ইহুদি জাতির মধ্যে পাঠালেন ঈসাকে (আ:)। বিশ্বনবীর (দ:) জন্মের পাঁচশত বছর আগে ইহুদি জাতির মধ্যে আসলেন ঈসা (আ:)। এর আগে যার মাধ্যমে আল্লাহ বনি ইসরাইল তথা ইহুদি জাতির জন্য ভারসাম্যপূর্ণ দীন যার মধ্যে আইন-কানুন, রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক বিধান ও দণ্ডবিধি অন্তর্ভুক্ত ছিল তা পাঠিয়েছিলেন তিনি ছিলেন মুসা (আ:)। মুসা (আ:) চলে যাওয়ার পর চিরাচরিতভাবে এর মধ্যে জন্ম নেয়া পণ্ডিত, পুরোহিত শ্রেণি যারা রাব্বাই, সাদ্দুসাই ও ফারেসি নামে পরিচিত ছিল তাদের বাড়াবাড়ি, দীনের খুঁটি-নাটি বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণ, অতি-বিশ্লেষণ, চুলচেরা বিচার ও ফতোয়ার কারণে দীনের মানবিক দিক, আত্মার দিক মরে গিয়ে ভারসাম্য নষ্ট হোয়ে গিয়েছিলো। ঐ বিকৃতি, ভারসাম্যহীনতাকে সংস্কার করতে আল্লাহ ঈসা (আ:) কে পাঠালেন। তিনি বুদ্ধ, কৃষ্ণ (আ:) এর মত আইন-কানুন বাদে আধ্যাত্মিক দিকটি পুনরুদ্ধার কোরে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে এসেছিলেন। ঈসা (আ:) তাঁর জাতিদের বোললেন, “তোমরা অন্য জাতিগুলোর মধ্যে যেওনা এবং কোনো সামারিয়ান শহরে প্রবেশ করো না। শুধুমাত্র ইসরাইলী বংশের মেষগুলোর কাছে যেতে থাকবে।” (Nwe Testament.Matt.১৫:২৪) ঈসা (আ:) যখন তাঁর ওপর আল্লাহর দেয়া দায়িত্ব পালনের প্রচার আরম্ভ কোরলেন অর্থাৎ বনী ইসরাইলীদের ভারসাম্যে ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু কোরলেন তখন সেইসব পুরোহিত শ্রেণি তাঁর বিরুদ্ধে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন। তিন বছর অক্লান্ত চেষ্টা কোরে ঈসা (আ:) ব্যর্থ হলেন বনি ইসরাইলের সত্যপথে আনতে। এই তিনবছরের প্রচেষ্টায় মাত্র ৭২ জন, মতান্তরে ১২০ জন ইহুদি তাঁর ওপর ঈমান এনে তাঁর দেখানো পথে চলতে শুরু করেন। ঐ পণ্ডিতশ্রেণি, তাদের তখনকার প্রভু রোমানদের সাহায্য নিয়ে ঈসাকে (আ:) কে হত্যার চূড়ান্ত ব্যবস্থা কোরলো তখন আল্লাহ তাঁকে সশরীরে পৃথিবী থেকে উঠিয়ে নিলেন এবং তাঁর যে শিষ্য জুডাস ইসকারিডাস ঈসা (আ:) কে রোমান ও পুরোহিতদের হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলো তার দেহ ও চেহারা অবিকল ঈসা (আ:) এর মত কোরে তাকে ক্রুশে উঠিয়ে মৃত্যুদণ্ড দিলো।
এরপর পল নামে একজন ইহুদি ঈসা (আ:) এর ওপর ঈমান আনলেন। তিনি কি সত্যিই ঈমান এনেছিলেন না ঈসা (আ:) শিষ্যদের মধ্যে ঢুকে বিভ্রান্ত কোরে তাদেরকে ঈসা (আ:) এর শিক্ষা থেকে বিচ্যুত করার উদ্দেশ্য ছিল তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
পল ঈসার (আঃ) শিষ্যদের মধ্যে ঢুকে যে কয়টি পরিবর্তনের চেষ্টা কোরলেন তার মধ্যে সর্বপ্রধানটি হোচ্ছে ঈসার (আঃ) শিক্ষাকে বনি ইসরাইলীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এটাকে বাইরে অ-ইহুদিদের মধ্যে প্রচার করা ও তাদের ঈসার (আঃ) শিষ্যত্ব গ্রহণ কোরতে আহ্বান করা। অনেক অপচেষ্টার পর পল সাহাবাদের মত বদলাতে সমর্থ হোলেন। পলায়নকারী এ শিষ্যরা উপলব্ধি কোরলেন যে, বনি ইসরাইলীদের মধ্যে ঈসার (আঃ) শিক্ষা প্রচার অসম্ভব। যেখানে ঈসা (আঃ) নিজে ব্যর্থ হোয়ে গেছেন সেখানে শিষ্যরা হতাশ হবেন তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। এক পর্যায়ে তারা বাধ্য হলেন ঈসার (আঃ) নীতি বিসর্জন দিয়ে অ-ইহুদিদের মধ্যে তার আদর্শ প্রচার না কোরতে। ওরা ভুলে গেলেন ইহুদিদের বাইরে এই আদর্শ সম্পূর্ণ অচল।
পল ঈসার (আঃ) সঙ্গে থেকে সরাসরি তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন নি, তাঁর সাহচর্য পান নি। কাজেই ঈসার (আঃ) প্রকৃত শিক্ষা ও তাঁর মর্ম তিনি পান নি, অথচ ঈসা (আঃ) পৃথিবী থেকে চোলে যাবার বেশ পরে, যারা সর্বক্ষণ ঈসার (আঃ) সাহচর্যে থেকে ছিলেন, তাঁর কাছ থেকে সরাসরি শিক্ষা পেয়েছিলেন তাদের চেয়ে বড় প্রবক্তায় পরিণত হোয়ে দাঁড়ালেন এবং তিনি যে শিক্ষা প্রচার আরম্ভ কোরলেন তা ঈসার (আঃ) শিক্ষা থেকে শুধু বহু দুরে নয়, প্রধান প্রধান ব্যাপারে একেবারে বিপরীত। পলের হাতে পোড়ে সেটা এক নতুন ধর্মের রূপ নিয়েছে। বর্তমানে খ্রিস্টান ধর্মের অনেক পণ্ডিতরাই বোলছেন যে আমরা আজ যে খ্রিস্টধর্ম দেখি এটাকে খ্রিস্টধর্ম (Christianity) না বোলে পলিয় ধর্ম (Paulinity) বলা উচিত। যা হোক ঐসব কারণে ঈসার (আঃ) শিক্ষার ঐ বিকৃত রূপটাকে একটা নতুন নাম দেয়া দরকার হোয়ে পড়লো যার নাম দেয়া হোল খ্রিস্টধর্ম। পল কর্তৃক এই যে নতুন ধর্মটিকে ঈসার (আঃ) নামে সূত্রপাত করা হোল যে ঈসা (আঃ) তাঁর জীবনেও ‘খ্রিস্টধর্ম’ বোলে কোন ধর্মের নামই শোনেন নি।
এখন পল যখন ঐ ধর্মের একটা বিকৃত রূপ ইউরোপিয়ানদের সামনে উপস্থাপিত কোরে তা গ্রহণ কোরতে বোললেন তখন তারা দেখলো যে ঐ বিকৃত রূপটাও তাদের দেব-দেবী, ভূত-পেত্মী পূজার চেয়ে অনেক ভালো, অনেক উন্নত এবং এই ‘ধর্ম’ সম্পূর্ণ ইউরোপে গৃহীত হোল। পল ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের প্রচারে ইউরোপ এই একতরফা, ভারসাম্যহীন ধর্ম গ্রহণ কোরলো ও তা তাদের জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা কোরলো। কারণ পেছনে বোলে এসেছি যে, মানুষ কখনই সার্বভৌমত্ব নিজের হাতে নিয়ে আইন-কানুন তৈরি কোরে- সেই মোতাবেক সমষ্টিগত জীবন যাপনের চেষ্টা করে নি। ইউরোপে এই ধর্ম সার্বিকভাবে গৃহীত হবার পর এক বুনিয়াদী সমস্যা দেখা দিলো।
আইন-কানুন, দণ্ডবিধি, রাষ্ট্র ব্যবস্থা, অর্থনীতি, রাজনীতিহীন একটি ব্যবস্থা দিয়ে একটি সমষ্টিগত জীবন পরিচালনা অসম্ভব এটা সাধারণ জ্ঞান। অথচ পোপ ও ইউরোপীয় রাজারা সেই ব্যর্থ চেষ্টাই কোরলেন কারণ ধর্মীয় আদেশ-নিষেধ বাদ দিয়ে অর্থাৎ আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে প্রত্যাখ্যান কোরে নিজেরা সার্বভৌম হোয়ে নতুন সংবিধান, আইন-কানুন, দণ্ডবিধি প্রণয়ন কোরে নেয়া তখনও মানুষের কাছে অচিন্তনীয় ব্যাপার ছিলো। এই চেষ্টা কোরতে যেয়ে প্রতিপদে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনের ব্যাপারে সংঘাত আরম্ভ হোল এবং ক্রমশ তা এক প্রকট সমস্যারূপে দেখা দিলো। এই সংঘাতের দীর্ঘ ও বিস্তৃত বিবরণে না যেয়ে শুধু এটুকু বোললেই চোলবে যে এই সংঘাত এক সময়ে এমন পর্যায়ে যেয়ে পৌঁছালো যে ইউরোপীয় রাজা ও সমাজ নেতাদের সামনে দু’টো পথ খোলা রোইলো- হয় এই ধর্ম বা জীবন-ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ত্যাগ কোরতে হবে, আর নইলে এটাকে নির্বাসন দিতে হবে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সংকীর্ণ পরিধির সীমাবদ্ধতার মধ্যে, যেখান থেকে এটা রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কোন প্রভাব বিস্তার না কোরতে পারে। যেহেতু ধর্মকে মানুষের সার্বিক জীবন থেকে বিদায় দেয়া অর্থাৎ সমস্ত ইউরোপের মানুষকে নাস্তিক বানিয়ে দেয়া সম্ভব নয়, তাই শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় রাষ্ট্র ও সমাজ নেতারা দ্বিতীয় পথটাকে গ্রহণ কোরলেন এবং অষ্টম হেনরীর রাজত্বকালে ১৫৩৭ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে এই কাজ অর্থাৎ খ্রিস্টান ধর্মকে মানুষের সার্বিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কোরে ব্যক্তিগত জীবনে নির্বাসিত করা হোল, দাজ্জালের জন্ম হোল।
এই পাশ্চাত্য ইহুদি খ্রিস্টান সভ্যতার জন্ম মানব ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। দাজ্জালের বয়স এখন ৪৭৬ বছর। সমস্ত পৃথিবী আজ চামড়া দিয়ে জড়ানো বস্তুর মতো ইহুদি-খ্রিস্টান সভ্যতার করায়ত্ব হোয়ে গেছে। তার আত্মাহীন, স্রষ্টাহীন, নৈতিকতাহীন জীবনাদর্শ মেনে নিয়ে পৃথিবী আজ অন্যায়, অবিচার, অত্যাচার, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা এককথায় সীমাহীন অশান্তির মধ্যে নিমজ্জিত। এভাবে দাজ্জাল আজ তার শয়তানী রূপের মাধ্যমে পৃথিবীর প্রতি ইঞ্চি মাটিকে জাহান্নামে রূপ দিয়েছে।
[সমস্ত পৃথিবীময় অন্যায়, অবিচার, যুদ্ধ ও রক্তপাত ইত্যাদি নির্মূল করে ন্যায়, সুবিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৯৫ সনে এমামুযযামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী হেযবুত তওহীদ নামক আন্দোলনটি প্রতিষ্ঠা করেন। আল্লাহ তাঁকে প্রকৃত ইসলামের যে জ্ঞান দান কোরেছেন তা তিনি যতটা সম্ভব হোয়েছে বই-পুস্তক লিখে, বক্তব্যের মাধ্যমে প্রচারের চেষ্টা কোরেছেন।

এই নিবন্ধটি লেখকের বিভিন্ন লেখা থেকে সম্পাদনা কোরেছেন মোহাম্মদ ইয়ামিন খান। শিক্ষার্থী, ইংরেজী বিভাগ, সরকারী রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর।