আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি | হেযবুত তওহীদ

বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি

একটি সমাজের অর্ধেক জনশক্তিই হচ্ছে নারী। সেই অর্ধেক জনশক্তিকে বাদ দিয়ে একটি জাতি কখনোই প্রগতিশীল হতে পারে না। পৃথিবীর ইতিহাসে যে জাতিই বিপ্লব সৃষ্টি করেছে, সেই জাতির নারীরাই অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল। অথচ আজকের এই তথাকথিত সভ্য সমাজেও কি আমাদের নারীরা তাদের পূর্ণ অধিকারে অধিষ্ঠিত আছেন? না। বিশেষ করে জ্ঞান বিজ্ঞানের এই যুগে বহিঃর্বিশ্বে অনেকক্ষেত্রেই নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েও আমাদের এই সমাজে এখনো নারীদেরকে নানা ফতোয়ার বেড়াজালে আবদ্ধ রেখে অর্ধেক জনশক্তিকেই বিকলাঙ্গ করে রাখা হচ্ছে। অথচ পৃথিবীর ইতিহাসে যিনি সর্ববৃহৎ রেঁনেসা সৃষ্টি করেছিলেন, সেই রসুলের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় তিনি  আরবের সেই জাহেলিয়াতের যুগ, যেখানে নারীদের কোন মর্যাদা ছিল না, সেখান থেকে নারীদেরকে তুলে আনলেন। দিলেন পূর্ণ মর্যাদা, নিশ্চিত করলেন সমাজের সকল কাজে অংশগ্রহণ। সেই অবলা নারীরাই পরবর্তীতে হলেন এক একজন বীরাঙ্গনা, যারা যুদ্ধ করে রসুলকে রক্ষা পর্যন্তও করেছিলেন, যারা নির্মাণ করেছিলেন একটি সভ্য সমাজ। যে অবদানগুলোর ফল হিসেবে পরবর্তীতে রচিত হয়েছিল ইসলামের স্বর্ণযুগ।

ইসলাম কোনক্ষেত্রেই নারী-পুরুষের বৈষম্য করে না। কোরআন কিংবা রসুলের জীবনী কোথাও আমরা এমনটা পাই না। অথচ আমাদের তথাকথিত আলেমরা ইসলামের নামে নানা ফতোয়া দিয়ে নারীদের ঘরের চার দেয়ালে আবদ্ধ করে একটি ভোগ্যপণ্যতে পরিণত করেছেন, যারা পাচ্ছে না তাদের পূর্ণ মর্যাদা। আমরা হেযবুত তওহীদ ধর্মব্যবসায়ী আলেমদের এসব মিথ্যার বেড়াজাল থেকে নারীদের মুক্তির ডাক দিচ্ছি। তাদেরকে আহ্বান করছি, হে নারীরা, তোমদের জ্ঞান আছে, প্রজ্ঞা আছে, সমাজের সকল কার্যে অংশগ্রহণ করার যোগ্যতা আছে। তোমরা এগিয়ে আসো, মিথ্যার বেড়াজাল ছিন্ন করে সংগ্রামে অবতীর্ণ হও, যেমনটা রসুলের সেই অগ্রগামী নারীরা করেছিল। তবেই তোমরা সফলকাম হবে। আর রচিত হবে একটি সভ্য সমাজ।

ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবন-ব্যবস্থা। একটি ভারসাম্যপূর্ণ দ্বীনে, একটি সভ্য সমাজে কখনোই সঙ্গীত বা সংস্কৃতির মত এমন চিত্তাকর্ষক ও হৃদয়াগ্রাহী বিষয় হারাম হতে পারে না। সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে আমরা যদি কোরআন ও রসুলের জীবনীকে মূলনীতি হিসেবে ধরি তাহলে প্রথমেই দেখতে হবে সেখানে এই বিষয়ে কি বলা আছে। কোরআনে সরাসরি কোথাও গান হারাম এমনটা বলা নেই। আর ইসলামের একটি মূলনীতি হচ্ছে আল্লাহ যেগুলো হারাম করেছেন  সেগুলো ব্যতীত সবই হালাল। তাহলে সরাসরি গানকে হারাম বলার কোন যৌক্তিকতা নেই। এছাড়া আমরা রসুলের জীবনীতেও দেখবো, তিনি একজন সংগ্রামী, বিপ্লবী নেতা হওয়া সত্বেও সংস্কৃতিমনা ছিলেন। যখনই সময় পেতেন তিনি গান শুনতেন, সাহাবীদের উৎসাহ দিতেন গান শুনতে ও শুনাতে। তাহলে সঙ্গীতের মত চিত্তগ্রাহী একটি বিষয় কিভাবে আমাদের সমাজে হারাম বলে গৃহীত হচ্ছে? কারা এটাকে হারাাম করেছে?

সংস্কৃতির নামে যখন ব্যাপকভাবে অশ্লীলতার প্রসার ঘটল, মানবতাবিধ্বংসী কর্মকান্ড শুরু হল তখন আমাদের সমাজের ধর্মের ধ্বজাধারী আলেমরা সরাসরি গানকেই হারাম ঘোষণা দিলেন। কিন্তু অশ্লীলতা কি পরিহার হল? অথচ তারা বুঝলেন না, মাথা কাটার প্রতিষেধক কখনো মাথা কেটে ফেলা নয়। ইসলাম অশ্লীলতাকে হারাম করেছে, গানকে নয়। যে গানে অশ্লীলতার বিস্তার ঘটে, অনৈক্যের প্রকাশ পায়, সমাজে ঘৃণা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করে সেই গান হারাম। কিন্তু, যে গান মানবতার কথা বলে, ঐক্য-সাম্যের কথা বলে, আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলে সে গান শুধু হালালই নয়, এবাদত। এমনকি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য যে গান গাওয়া হবে তা জেহাদ হিসেবে পরিগণিত হবে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎস ছিল সঙ্গীত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে উদ্দীপ্ত করে রেখেছিল যেসব গান, যে গানের বাণী ও সুরে ছিল সাহসের কথা, যুদ্ধ জয়ের সম্ভাবণা-মন্ত্র, সেসব গান কি করে হারাম হতে পারে?

সঙ্গীত, শিল্প, সংস্কৃতি-সাহিত্যমনা- এগুলো মানুষের সহজাত প্রতিভা। ইসলাম কখনোই মানুষের এমন সৃজনশীল প্রতিভার বিকাশে বাধা দিতে পারেনা। ইসলাম নিয়ে বাড়াবাড়ির দরুন আজকের সমাজে গান হারামের মত এমন বহু বিকৃত ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে।

একটি শক্তিশালী, বহির্মুখী, গতিশীল জাতির জন্য প্রয়োজন সুস্থ, সবল, গতিশীল, উদ্দমী নাগরিক। অসুস্থ, রুগ্ন দুর্বল নাগরিকদের দিয়ে জাতির সামষ্টিক উন্নতি আশা করা যায় না। একটি জাতির ক্ষুদ্রতম একক হল ব্যক্তি। ব্যক্তির সম্মিলিত শক্তিই হলো একটি জাতির শক্তি। আর সুস্থ, সবল নাগরিক গড়ে তুলতে খেলাধুলা ও শরীর চর্চার কোনো বিকল্প নেই।
কাজেই হেযবুত তওহীদ আন্দোলনের সদস্যদের মধ্যে শারীরিক সুস্থতা, ক্ষিপ্রতা, গতিশীলতা, সাহসিকতা ইত্যাদি বৃদ্ধির জন্য খেলাধুলার ব্যবস্থা রয়েছে। এক্ষেত্রে দেশীয় বা আন্তর্জাতিক বহিরাঙ্গনের (আউটডোর) খেলা যেমন কাবাডি, হা-ডু-ডু, ফুটবল, দৌঁড়, সাতার, ব্যাডমিন্টন ইত্যাদিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। যেসব খেলা মানুষকে অন্তর্মুখী ও স্থবির করে ফেলে সেগুলো নিরুৎসাহিত করা হয় এবং যে কোনো খেলায় অসুস্থ প্রতিযোগিতা, অর্থের লেনদেন, জুয়া বা বাজি ইত্যাদি এড়িয়ে চলতে বলা হয়।
ইসলামে শরীর গঠনমূলক খেলাকে যথেষ্ট উৎসাহিত করা হয়েছে। আল্লাহর রসুল (স.) স্বয়ং মসজিদে নববীর সামনে খেলাধুলার আয়োজন করতেন, কুস্তি, তীর বা বর্শা নিক্ষেপ, ঘোড়দৌড় ইত্যাদিতে নিজে অংশ নিতেন এবং তাঁর আসহাবদেরকেও এ ব্যাপারে উৎসাহিত করতেন।
মহামান্য এমামুয্যামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী নিজেও একজন জাতীয় পর্যায়ের ক্রীড়াবিদ ছিলেন। তিনি মানুষখেকো বাঘসহ বহু হিং¯্র প্রাণী শিকার করেছেন। তিনি ফুটবল, কাবাডি খেলতেন। রায়ফেল শ্যুটার হিসাবে তিনি বিশ্ব অলিম্পিকে মনোনীত হয়েছিলেন। যুব সমাজকে সুস্থ বিনোদনে উৎসাহী করার জন্য এবং বাংলাদেশের জাতীয় খেলা কাবাডিকে আবার জনপ্রিয় করে তোলার জন্য তিনি তাঁর জীবনদ্দশায় ‘তওহীদ কাবাডি দল’ প্রতিষ্ঠা করেন যার মাধ্যমে হেযবুত তওহীদের সদস্যরা সারা দেশে অসংখ্য কাবাডি টুর্নামেন্টের আয়োজন করে আসছেন। তওহীদ কাবাডি দল জাতীয় কাবাডি ফেডারেশনের সদস্য হিসাবে বিভিন্ন টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে কৃতিত্বের পরিচয়ও দিয়েছে। মহামান্য এমামুয্যামানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে মাননীয় এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিমও ‘তওহীদ ফুটবল ক্লাব’ গঠন করেছেন।